ইসলামি বর্ষপঞ্জির বারোটি মাসের প্রতিটিই স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। তবে এর মধ্যে চারটি মাস এমন, যাদের সম্মান সৃষ্টির আদিকাল থেকেই আল্লাহ তাআলার বিধানে সুনির্দিষ্ট। হিজরি বর্ষের সূচনা মাস ‘মুহাররম’ সেই সম্মানিত চারটি মাসের অন্যতম— যাকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ ‘শাহরুল্লাহ’ তথা আল্লাহর মাস বলে অভিহিত করেছেন। সময়ের পরিক্রমায় আমাদের দোরগোড়ায় চলে এসেছে আরেকটি নতুন হিজরি বছর। এই মুহূর্তটি আত্মসমালোচনা, তওবা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ সুযোগ। 🔷 হিজরি সনের ঐতিহাসিক পটভূমি হিজরি সনের সূচনা ইসলামের ইতিহাসের এক মহাঘটনাকে কেন্দ্র করে — রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মক্কা থেকে মদিনায় ঐতিহাসিক হিজরত। হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে, হিজরতের সতেরো বছর পর, আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর উত্থাপিত তারিখ-বিভ্রান্তির প্রশ্নটি একটি পরামর্শ সভায় আলোচিত হয়। হযরত আলী (রা.)-এর প্রস্তাবক্রমে হিজরতের বছরটিকে ভিত্তি ধরে ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সন গণনা শুরু হয়। হিজরি সন নিছক একটি আরবি ক্যালেন্ডার নয় — এটি মুসলিম উম্মাহর সামষ্টিক আত্মপরিচয়ের ঐতিহাসিক দলিল। রমাদানের সিয়াম, হজ্জের সময়, যাকাতের হিসাব, ঈদ, আশুরার সিয়াম— ইসলামের প্রতিটি মৌলিক ইবাদত এই চন্দ্রবর্ষের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পৃক্ত। তাই বিজ্ঞ স্কলারগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন, হিজরি সনের হিসাব সংরক্ষণ করা মুসলিম সমাজের উপর ফরজে কেফায়া। অথচ গভীর পরিতাপের বিষয় এই যে, সমকালীন মুসলিম সমাজের বৃহত্তর অংশ রমাদান ও ঈদের বাইরে হিজরি তারিখ সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। যে ব্যক্তি হিজরি তারিখের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখে না, সে অজান্তেই আল্লাহর নির্ধারিত বরকতময় মুহূর্তগুলো থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে ফেলে। 🔷 মুহাররমের অতুলনীয় মর্যাদা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন— ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি— আল্লাহর কিতাবে, সেদিন থেকে যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত দীন।’ (সূরা তাওবাহ: ৩৬) এই চারটি মাসের মর্যাদা কোনো পরিবর্তনীয় বিধান নয়— এটি সৃষ্টির আদিমুহূর্ত থেকে সময়ের কাঠামোতে অন্তর্নিহিত একটি আসমানি ব্যবস্থা। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন — রমজানের পর সর্বোত্তম সিয়াম হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের সিয়াম। (সহিহ মুসলিম: ১১৬৩) 'শাহরুল্লাহ' — এই সম্বোধনটিই মুহাররমের শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। পবিত্র কাবাকে "বাইতুল্লাহ", সালেহ ﷺ -এর উটনিকে ‘নাকাতুল্লাহ’ এবং জাহান্নামের আগুন কে ‘ নারুল্লাহ’ বলা হয়েছে। আল্লাহর সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করা হয় কেবল তখনই, যখন সেটা অনন্য মহিমা ও পবিত্রতার অধিকারী। মুহাররমকে 'আল্লাহর মাস' বলে এই মাসকে এক অনন্য উচ্চতায় সমাসীন করা হয়েছে। 🔷 এই মাসে আমাদের করণীয় কুরআন ও হাদিসের আলোকে মুহাররম মাসে একজন মুমিনের সামনে পাঁচটি মূল করণীয় স্পষ্ট হয়: ১. সিয়ামের মাধ্যমে ইবাদতে নিমগ্ন হওয়া। বিশেষত ১০ মুহাররম তথা আশুরার দিনে এবং তার পূর্ববর্তী বা পরবর্তী একটি দিনে সিয়াম পালন সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। হযরত আবু কাতাদাহ রা. বর্ণিত হাদিসে এসেছে, আশুরার সিয়ামের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন। (সহিহ মুসলিম: ১১৬২) ২. নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্যবোধ বজায় রাখা রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন জানতে পারলেন যে ইহুদিরাও আশুরার দিনে রোজা রাখে, তখন তিনি ঘোষণা করলেন — আগামী বছর বেঁচে থাকলে আমি ৯ তারিখেও রোজা রাখব। (সহিহ মুসলিম: ১১৩৪) রাসূল ﷺ এর এই নির্দেশনা সুস্পষ্ট বার্তা দেয় যে, ইসলাম অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুকরণ থেকে মুসলিম উম্মাহকে সর্বদা স্বাতন্ত্র্যতা রক্ষার নির্দেশ দেয়। সুতরাং ৯ ও ১০ মুহাররম একত্রে রোজা রাখা শুধুমাত্র আমল নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর স্বাতন্ত্র্য পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ। যা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলিম হিসেবে লালন করা আবশ্যক। পাশাপাশি হিজরি সন মুসলিম উম্মাহর সভ্যতা ও সংস্কৃতিগত স্বাতন্ত্র্যের অন্যতম অকাট্য দলিল। খ্রিস্টানদের যেমন নিজস্ব ইংরেজি সন রয়েছে, তেমনি মুসলিমদের রয়েছে হিজরি সন। তাই এই নতুন হিজরি বর্ষের সূচনায় কোনো অপসংস্কৃতির অনুকরণ না করে, ৯ ও ১০ মুহাররম একত্রে রোজা রাখা এবং হিজরি তারিখ ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের মুসলিম পরিচয়ের গৌরব ও স্বাতন্ত্র্যকে সমুন্নত রাখার সংকল্প করা উচিত। ৩. তাওবা ও ইস্তিগফারে সর্বোচ্চ মনোনিবেশ করা। এই মাসে এমন একটি দিন রয়েছে, যেদিন আল্লাহ তাআলা একটি সম্প্রদায়ের তাওবা কবুল করেছিলেন। (তিরমিজি: ৭৪১) এই মাসটি ক্ষমা ও আত্মসমর্পণের মাস — এই সুযোগকে অবহেলায় হাতছাড়া করা কোনোভাবেই বিবেকসম্মত নয়। ৪. সকল প্রকার পাপাচার থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকা। হারাম মাসে পাপের ভার ও পরিণাম উভয়ই অধিকতর গুরুতর। কুরআনের নির্দেশ — "এই মাসগুলোতে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।" — এই আদেশ আমাদের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা। ৫. আত্মসমীক্ষা ও আত্মপুনর্গঠনের সংকল্প গ্রহণ করা। হিজরি নববর্ষের সূচনা জীবনের সামগ্রিক গতিপথ পুনর্বিবেচনার এক সুবর্ণ মুহূর্ত। বিগত বছরের আমল ও চরিত্রের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করে নতুন বর্ষে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করাই হিজরি নববর্ষের প্রকৃত শিক্ষা। যে উম্মত তার নিজস্ব বর্ষপঞ্জির প্রতি উদাসীন, সে উম্মত আল্লাহর নির্ধারিত বরকতের মৌসুমগুলো থেকে অনিবার্যভাবে বঞ্চিত হয়। আসুন, এই মুহাররমে কেবল আচারিক উদযাপনে সীমাবদ্ধ না থেকে এই মাসের প্রকৃত দাবিগুলো পূরণে সচেষ্ট হই। তাওবার মাধ্যমে অতীতকে পরিশুদ্ধ করি, সুদৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে ভবিষ্যতকে আল্লাহমুখী করি। হে আল্লাহ! আমাদের জন্য মুহাররম মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা আপনার সম্মানিত মাসগুলোকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে এবং আপনার দিকে তাওবার সাথে প্রত্যাবর্তন করে। আমিন।
Related Articles